আমরা এই সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চাই না : মিয়া গোলাম পরওয়ার
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের পরিকল্পনা নতুন নয়। প্রায় তিন মাস ধরে সেই পরিকল্পনা সরকারের হাতে রয়েছে। এখন নতুন করে পরিকল্পনা চাওয়ার পরিবর্তে গত ২১ মে দেওয়া ১০ দফা সুপারিশের কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, কোনটির কাজ শুরু হয়েছে এবং কোনগুলো এখনো কাগজে পড়ে আছে, তা জনগণের সামনে পরিষ্কার করতে হবে।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাতে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেশের চলমান জ্বালানি সংকট ও উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, গত ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী দেশের চলমান বিদুৎ, জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে বিরোধী দলগুলোর কাছে একটি কার্যকর পরিকল্পনা চেয়েছেন। আমরা তার এই আহ্বানকে ইতিবাচকভাবেই দেখতে চাই। তবে শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমাদের পরিকল্পনা নতুন নয়। সেটি গত তিন মাস ধরেই সরকারের টেবিলে রয়েছে। বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিলের কারণে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ভোগান্তি এখনও চলছে, যা সরকার নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও কোনো সুফল আনতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, ২১ মে জাতীয় সংসদের জ্বালানি সংকটসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যরা লিখিতভাবে ১০ দফা সুপারিশ জমা দিয়েছিলেন। ওই কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্য ছিলেন, যাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর তিনজন সদস্যও ছিলেন। তারা দুটি বৈঠকে অংশ নিয়েছেন, প্রশ্ন তুলেছেন এবং সংকট মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ৭ জুন জ্বালানিমন্ত্রী নিজেই সেই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ওই প্রস্তাবগুলো ছিল একেবারেই বাস্তবভিত্তিক। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে বিদ্যমান কূপে ওয়ার্কওভার, ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাসকে জাতীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ, স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে অনুসন্ধান জোরদার, স্থাপিত এসপিএম দ্রুত চালু করা, ডিপো থেকে গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল মনিটরিং, কার্যকর নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে রুফটপ সোলার সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা নিরূপণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘আজকের মূল প্রশ্নটি পরিকল্পনা আছে কি নেই, সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো, ২১ মে থেকে সরকারের হাতে থাকা এই পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, কোন সুপারিশে কাজ শুরু হয়েছে এবং কোনগুলো এখনো কাগজেই পড়ে আছে। আজ আমরা সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর চাই এবং একই সঙ্গে দেখাতে চাই, দেশের এই সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দল শুধু সমালোচনা করেনি, বরং সময়মতো দায়িত্বশীল ও বাস্তবসম্মত বিকল্পও দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, গত ১৪ আগস্ট ২০২৬ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এ সংকট নিরসনে জাতীয় সংসদের জরুরি অধিবেশন আহ্বান করতে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছেন, যার কপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও দেওয়া হয়েছে।
‘পরিকল্পনার অগ্রগতি প্রধানমন্ত্রীকে পরিষ্কার করতে হবে’
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তিন মাস আগে যে পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছিল, তার অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকে তা পরিষ্কার করতে হবে। এই সংকট সমাধানের লক্ষ্যে বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে জরুরি সংসদীয় অধিবেশন আহ্বানের যে দাবি জানানো হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি।
‘দেশ কারও একার নয়, দেশ সবার’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের সামনে আসতে বলেছেন। আমরা বিনয়ের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জাতীয় সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যরা ২১ মে লিখিতভাবে ১০ দফা সুপারিশ জমা দিয়েছেন। সরকারি ও বিরোধী দলের পাঁচজন করে সদস্য নিয়ে ওই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ৭ জুন সেই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়। কমিটির নিজস্ব ১২ দফার পাশাপাশি বিরোধী দলের ১০ দফা সুপারিশও প্রতিবেদনের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমাদের পরিকল্পনা কোনো গোপন দলিল নয়। এটি সংসদের নথিতে রয়েছে। সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। ইতোপূর্বে, গত ৮ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব-সম্বলিত বক্তব্য পেশ করেছিলাম।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তাব
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে হবে। দ্রুত ফলদায়ক কূপগুলোতে ওয়ার্কওভার করতে হবে। ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাস অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। স্থল ও সমুদ্রভাগে নতুন অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। বাপেক্সের সক্ষমতা শক্তিশালী করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং দ্রুত কার্যকর করার কথা বলেছি। জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় ডিজিটাল পর্যবেক্ষণের কথা বলেছি। সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর কথা বলেছি। ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সমীক্ষার প্রস্তাব দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘তাই আজ আমাদের প্রশ্ন খুবই সরল। পরিকল্পনা যখন ২১ মে থেকেই সরকারের কাছে আছে, তাহলে গত প্রায় তিন মাসে সেই পরিকল্পনার কোনটি বাস্তবায়িত হয়েছে? কোনটির কাজ শুরু হয়েছে? কোনটি গ্রহণ করা হয়নি? আর গ্রহণ করা না হলে কেন হয়নি? আমরা নতুন কোনো কাগজ জমা দেওয়ার প্রতিযোগিতা চাই না। আমরা ইতোমধ্যে জমা দেওয়া পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে চাই।’
‘হারিকেনের সামনে ফ্যান চলার ছবি দিয়ে সংকটের বাস্তবতা খণ্ডন করা যায় না’
জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘হারিকেনের সামনে ফ্যান চলার ছবি দিয়ে দেশের জ্বালানি সংকটের বাস্তবতা খণ্ডন করা যায় না।’
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী একটি প্রতিবাদের ছবি নিয়ে কথা বলেছেন। সামনে হারিকেন, পেছনে ফ্যান, এটিকে তিনি হঠকারিতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আমরা মনে করি, একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে একটি জায়গায় ফ্যান চলছিল কি চলছিল না, এটি দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মূল্যায়নের মানদণ্ড হতে পারে না। হারিকেন একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীক হতে পারে। তার জবাব হওয়া উচিত তথ্য দিয়ে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। জুলাইয়ে একটি এফএসআরইউ বন্ধ হওয়ার পর দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি বলেন, তাদের আগের নথিতে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এবং সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। একজন মানুষ যখন গ্যাস চান, তিনি অরাজকতা চান না। একজন শ্রমিক যখন কারখানা চালু রাখার দাবি করেন, তিনি ষড়যন্ত্র করেন না। একজন উদ্যোক্তা যখন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি চান, তিনি সরকারের শত্রু নন। মানুষ চুলায় গ্যাস চায়, কারখানায় উৎপাদন চায়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চায়। এ দাবির জবাব রাজনৈতিক ব্যঙ্গ দিয়ে নয়, কার্যকর সমাধান দিয়ে দেওয়া উচিত।
‘শুধু তৃতীয় এফএসআরইউ দিয়ে গ্যাস সংকটের সমাধান হবে না’
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা নতুন এফএসআরইউ নির্মাণের বিরোধিতা করছি না। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন হলে আমদানি করা এলএনজি গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কিন্তু একটি মৌলিক সত্য জনগণকে বলতে হবে। এফএসআরইউ নিজে গ্যাস উৎপাদন করে না। এফএসআরইউ চালাতে এলএনজি আমদানি করতে হবে। সেই এলএনজি কিনতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন। এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করার পর সেটি জাতীয় গ্রিডে পাঠাতে পর্যাপ্ত পাইপলাইন প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ‘আরেকটি বড় প্রশ্ন অর্থের। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় এবং প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সরকারি ভর্তুকির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং তৃতীয় এফএসআরইউ নির্মাণ করুন। প্রয়োজন হলে আমরা সমর্থন করব।’
‘কিন্তু একই সঙ্গে বলতে হবে, এলএনজি কোথা থেকে আসবে? কত দামে আসবে? দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি কী হবে? পাইপলাইন কখন হবে? দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কত বাড়বে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু একটি নতুন ভাসমান টার্মিনালকে পুরো সংকটের সমাধান হিসেবে দেখানো বাস্তবসম্মত হবে না’—বলেন তিনি।
৯০ দিনে ছয়টি কাজের প্রস্তাব
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা বলছি, ৯০ দিনে কী করা সম্ভব। আমরা জনগণকে অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না। তিন মাসে সমুদ্রের নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের ফল পাওয়া সম্ভব নয়। তিন মাসে একটি বড় নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তিন মাসে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ সম্পূর্ণ বাস্তবায়নও সম্ভব নয়। যেই এসবের প্রতিশ্রুতি দিক না কেন সেটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।’
তিনি বলেন, তাদের নিজস্ব পরিকল্পনাতেও এ সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে। তবে ৯০ দিনে অন্তত ছয়টি দৃশ্যমান কাজ করা সম্ভব।
১. দ্রুত ফলদায়ক গ্যাসকূপে ওয়ার্কওভার : প্রথম ১৫ দিনের মধ্যে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স দ্রুত ফলদায়ক ওয়ার্কওভারযোগ্য কূপের অগ্রাধিকার তালিকা প্রকাশ করবে। ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষ করা হবে। ৯০ দিনের মধ্যে প্রথম কয়েকটি কূপের কাজ সম্পন্ন না হলেও শুরু করে জনগণকে জানানো হবে, কত মিলিয়ন ঘনফুট নতুন গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা হলো।
২. বন্ধ ও কম উৎপাদনশীল কূপের হিসাব প্রকাশ : দেশে কতটি কূপ কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে, কোনটি সংস্কার করলে আবার উৎপাদনে আনা যাবে, ৩০ দিনের মধ্যে তার পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করতে হবে। এগুলো জনগণের সম্পদ। জনগণের সেই হিসাব জানার অধিকার রয়েছে।
৩. ভোলার গ্যাস ব্যবহারে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বাড়ানো : ভোলায় গ্যাস রয়েছে, কিন্তু মূল ভূখণ্ডে আনার প্রয়োজনীয় স্থায়ী পাইপলাইন নেই। পাইপলাইন তিন মাসে হবে না। কিন্তু সিএনজি বা এলএনজি আকারে পরিবহনের বিদ্যমান ব্যবস্থা আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করা যায়। এটি স্থায়ী সমাধান নয়, কিন্তু সংকটের সময়ে একটি অন্তর্বর্তী সেতু হতে পারে।
৪. সিস্টেম লস ও অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা : প্রতিটি বিতরণ কোম্পানির জন্য ৯০ দিনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে কতটি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলো, কত গ্যাস সাশ্রয় হলো, সে তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
৫. গ্যাস বণ্টনের প্রকাশ্য সময়সূচি : ঘাটতি যদি থাকে, সেটি লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। কোন সময়ে কোন খাত গ্যাস পাবে, শিল্প, বিদ্যুৎ, সার ও আবাসিক খাতের জন্য যতটা সম্ভব পূর্বঘোষিত সময়সূচি প্রকাশ করতে হবে। একজন গৃহিণী যেন জানতে পারেন কখন চুলা জ্বলবে। একজন শিল্পোদ্যোক্তা যেন জানতে পারেন কখন উৎপাদনের পরিকল্পনা করবেন।
৬. এসপিএম ও ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ দ্রুত কার্যকর করা : যে অবকাঠামো ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেগুলো ফেলে রেখে নতুন প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে লাভ নেই। সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং দ্রুত কার্যকর করতে হবে এবং ডিপো থেকে গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক জট ভাঙতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, বাংলাদেশে শুধু পরিকল্পনার অভাব নেই, বাস্তবায়নের গতিরও সমস্যা রয়েছে। একটি কূপে কাজ করার সিদ্ধান্ত থেকে বাস্তবে কাজ শুরু করতে নানা স্তরের অনুমোদন, সংশোধন, দরপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়।’
জামায়াতের চার প্রশাসনিক সংস্কারের প্রস্তাব
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, দেশের এই ক্রান্তিকালে সব স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে National Emergency Energy Cell গঠন করা হোক। নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার মধ্যে জরুরি ওয়ার্কওভার ও সংস্কারকাজের অনুমোদনক্ষমতা পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের পরিচালনা পর্ষদে দেওয়ার বিষয় বিবেচনা করার প্রস্তাব দেন তিনি।
তিনি বলেন, রূপপুর বেস লোড প্ল্যান্ট উৎপাদনে আসলে কখন আসবে এবং এর ট্যারিফ কত হবে, তা দেশের জনগণ জানতে চায়।
জরুরি দরপত্র মূল্যায়নের জন্য স্থায়ী মূল্যায়ন ব্যবস্থা তৈরি এবং অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর জন্য একক তদারকি ব্যবস্থা করারও প্রস্তাব জানিয়ে তিনি বলেন, কোন ফাইল কোথায় কত দিন আটকে আছে, সেই তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, চট্টগ্রামের মহেশখালীতে এবং পটুয়াখালীর পায়রাতে টার্মিনাল করার কথা ছিল। সেটার আসলে কী হয়েছে আমরা কেউই জানি না। খুলনার খালিশপুরে রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি তৈরি হয়ে বসে থাকলেও আজও বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জের জবাবে জামায়াতের প্রস্তাব মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, আপনি বলেছেন পরিকল্পনা দিন। আমরা বলছি, পরিকল্পনা ২১ মে থেকেই সরকারের কাছে আছে। আপনি বলেছেন, ভালো পরিকল্পনা হলে বাস্তবায়ন করবেন। আমরা বলছি, বিরোধী দলের ১০ দফা এবং সংসদীয় বিশেষ কমিটির ১২ দফাকে সামনে রেখে আজ থেকেই একটি যৌথ বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করুন।’
তিনি বলেন, সরকার, বিরোধী দল, পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, বিপিডিবি, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী ও স্বাধীন জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। আজ থেকে ৯০ দিন পর জাতীয় সংসদে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে হবে।
তিনি বলেন, সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটি হয়নি, কত গ্যাস বেড়েছে, কত সিস্টেম লস কমেছে, কত অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে জনগণ সেই হিসাব দেখুক। তাদের প্রস্তুত করা খসড়ায়ও ৯০ দিন পর অগ্রগতি প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন এবং বিরোধী দলের সদস্যসহ বিশেষ কমিটির মাধ্যমে নিয়মিত পর্যালোচনার প্রস্তাব রয়েছে।
‘আমরা এই সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চাই না’
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা এই সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চাই না। কারণ জ্বালানি সংকটে সরকার ব্যর্থ হলে শুধু সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই মা, যিনি সকালে চুলা জ্বালাতে পারেন না। ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই শ্রমিক, যার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই উদ্যোক্তা, যিনি সময়মতো পণ্য তৈরি বা রপ্তানি করতে পারেন না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকুক। সমালোচনা থাকুক। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের প্রতিযোগিতা হোক, কে বেশি কার্যকর সমাধান দিতে পারে, কে বেশি স্বচ্ছ থাকতে পারে, কে জনগণের কাছে বেশি জবাবদিহি করতে পারে’—বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা আপনার সরকারের কাছেই আছে। আজ আবারও আমরা সেটি সামনে রাখলাম। এখন প্রশ্ন একটাই, বাস্তবায়ন শুরু হবে, নাকি আবার নতুন পরিকল্পনা ও নতুন কমিটির অপেক্ষায় থাকতে হবে? আমরা ৯০ দিন পর হিসাব চাইব। সরকারকে বিব্রত করার জন্য নয়, দেশের মানুষের পক্ষে। আর দেশের স্বার্থে সরকার যদি কোনো কার্যকর, স্বচ্ছ ও বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ নেয়, দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে আমরা সহযোগিতা করব।’
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এমএসএস

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: