সাবেক মার্কিন কূটনীতিক

ওয়ান-ইলেভেনে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের ভূমিকায় বিরাট ভুল ছিল

প্রকাশিত: ০৮ মার্চ ২০২৫ ২১:০৩ পিএম

ওয়ান-ইলেভেনে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মার্কিন সরকারের নীতি এবং ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ভূমিকায় বিরাট ভুল ছিল বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন এফ ড্যানিলোভিচ।

শনিবার ‘নতুন ভোরের পথে ঢাকা: গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন গতিপথ’ শীর্ষক এক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক উপরাষ্ট্রদূত এই মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম এবং সাবেক উপরাষ্ট্রদূত জন এফ ড্যানিলোভিচ অংশ নেন। স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্থার চেয়ারম্যান মুনিরা খান। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সাবেক এই দুই মার্কিন কূটনীতিক।

আলোচনায় সাবেক দুই মার্কিন কূটনীতিক বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রতি তাদের দেশের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিশ্রুতি নিয়ে মতামত ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সমর্থন করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের ভূমিকা এবং নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর আলোকপাত করেন। ড্যানিলোভিচ বলেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব কেবল বাংলাদেশের জনগণের। কারণ এই আন্দোলনটি সম্পূর্ণরূপে এ দেশেই সৃষ্ট হয়েছিল। যার ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন।

গত ১০ বছর বাংলাদেশে আসার জন্য ভিসা পাননি উল্লেখ করে উইলিয়াম বি মাইলাম বলেন, আমরা একটি ছোট সংগঠন গঠন করি এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে সচেতনে কাজ করি। গত পাঁচ বছরে আমরা অর্থায়নের ব্যবস্থা করেছি এবং এই উদ্যোগকে সমর্থন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশে আসতে পেরে আমি আনন্দিত।

২০০৭-০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিরাট ভুল করেছিল উল্লেখ করে জন এফ ড্যানিলোভিচ বলেন, রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস কিংবা আমার সহকর্মীরা এক–এগারো ঘটাননি। আমি মনে করি না, কোনো গোপন ‘কফি গ্রুপ’ সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাংলাদেশের জনগণকে বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দিয়েছিল। তখন জেনারেল ও ব্রিগেডিয়ারদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ সময় তিনি বলেন, ৯০ সালে গণতন্ত্রের অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুতি ঘটেছিল। বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনতে হলে মৌলিক সংস্কার দরকার।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের চাওয়াকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। আমরা নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু আমরা সেনাবাহিনীর কথাই বেশি শুনেছি। সম্ভবত সে কারণেই গণতন্ত্রের উত্তরণ নিয়ে প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়নি।

সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে নিজেদের ভুলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ঢাকায় তিনবার কূটনীতিকের দায়িত্ব পালন করা জন ড্যানিলোভিচ বলেন, আমাদের দ্বিতীয় ভুলটি ছিল দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস হিসেবে আমিও নির্বাচনের সময়সীমার ওপরই বেশি জোর দিয়েছিলাম। নির্বাচন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের দীর্ঘ সময়ের রায় (ম্যান্ডেট) ছাড়া কোনো সরকার পরিচালিত হতে পারে না। আর নির্বাচিত সরকারকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত। ওই সময় মৌলিক কিছু সংস্কার সাধনের প্রয়োজন ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংস্কারের এজেন্ডাও এগিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু একটা সময়ে এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, নির্বাচনের আয়োজন করে দায়িত্ব হস্তান্তরই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

তিনি বলেন, তখনকার সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর থেকে তাদের সব ধরনের প্রভাব হারিয়ে ফেলল। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের গোপনে বোঝাপড়া হয়েছিল। তাই আমাদের জানা সম্ভব ছিল না সাবেক প্রধানমন্ত্রী কোন শর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে আপসরফা করেছিলেন। আমরা এর কোনো পক্ষ ছিলাম না। আমরা ধারণা করেছিলাম শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছে যেহেতু তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

সাবেক এই মার্কিন কূটনীতিক বলেন, ইতিহাস ভুল প্রমাণ করল। আমাদের যা বলা হয়েছিল তা ভুল প্রমাণিত হলো। আমরা দেখলাম ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অধোগতি ঘটতে থাকল, যার চূড়ান্ত রূপ দেখলাম ২০২৪ সালের নির্বাচনে।

জন ড্যানিলোভিচ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এখন সংস্কারের বিষয়ে যা করছে, তা হলো ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রতিফলন। বিদ্যমান জটিল পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে যুক্ত করে বেসামরিক সরকারের গুরুত্ব তুলে ধরে বর্তমান সরকার সংস্কারের বিষয়ে যেভাবে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর