জাতীয় পার্টির দুর্গে 'লাঙ্গলের জানাজা', ছবি ভাইরাল
জাতীয় পার্টির (জাপা) দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুরে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে দলটি। ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত রংপুরে ঘটেছে চরম ভরাডুবি। দলটির চার দশকের ইতিহাসে এই প্রথম রংপুরসহ সারাদেশে ১৯৬টি আসনে প্রার্থী দিয়েও একটিতেও জয়ের দেখা পায়নি লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থীরা।
আওয়ামী লীগের মিত্র হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির এই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে রংপুরে জামায়াতে ইসলামীর উত্থান হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, লাঙ্গল এর আবেগ থেকে সরে এসে রংপুরের মানুষ পরিবর্তিত রাজনীতির পক্ষে রায় দিয়েছেন।
নির্বাচনের ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের রংপুর-৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনে তৃতীয় হয়েছেন। একইভাবে দলের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ আসনেও তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন।
এদিকে দলটির ভরাডুবিকে কেন্দ্র করে রংপুরে শুরু হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া। সামাজিক মাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এর মধ্যেই একটি ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
ভাইরাল হওয়া ছবিতে দেখা যায়, সামনে একটি লাঙল রেখে তার জানাজার নামাজ পড়া হচ্ছে। কয়েকটি ফেসবুক পেজে ছবিটি শেয়ার করে লেখা হয়েছে, ‘রংপুরের মাটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে লাঙ্গলের নামাজে জানাজা সম্পন্ন হলো।’ তবে ছবিটি কোথায় এবং কবে তোলা হয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানা যায়নি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রংপুর মহানগরের সাবেক মুখপাত্র নাহিদ হাসান খন্দকার তার ফেসবুকে ছবিটি পোস্ট করে লিখেছেন, আমিন।
অন্যদিকে, জাতীয় ছাত্রশক্তির রংপুর মহানগরের আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, লীগের গৃহপালিত জাতীয় পার্টি ইন্তেকাল করেছে। ধন্যবাদ রংপুরবাসী। ধন্যবাদ এই যুদ্ধের সকল নায়ককে, তৃপ্তি।
সংবাদকর্মী ও ছড়াকার জয়নাল আবেদীন লিখেছেন, রংপুরের জনগণ আবেগের লাঙ্গল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আবারও ভুল করেছে।
ভোটগ্রহণ শেষে ব্যালট পেপার গণনার সময় আতিক হাসান নামে আরেক সংবাদকর্মী লিখেছেন, রংপুরে আইসিইউতে জাতীয় পার্টি। সন্ধ্যার পর মৃত ঘোষণা হতে পারে। জাপার ভোটের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন।
ভাইরাল ছবিকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদল একে ‘রাজনৈতিক প্রতীকী প্রতিবাদ’ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে অনেকে এটিকে ‘অতিরঞ্জিত ও অসম্মানজনক’ বলে মন্তব্য করছেন।
রংপুর শহরই দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ-এর বাড়ি। ফলে এ অঞ্চলে বরাবরই লাঙলের শক্ত ভোটব্যাংক ছিল। কিন্তু এবার সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা এগিয়ে থাকায় জাতীয় পার্টি কোনো আসনেই জয় পায়নি।
এবার রাজনৈতিক পালাবদলে রংপুরে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এরশাদের হাতেগড়া জাতীয় পার্টির দুর্গ তছনছ করে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে জামায়াতের ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। রংপুরের ৬টি আসনের ৫টিতে বিজয়ী হয়েছে জামায়াত ও একটিতে জোটসঙ্গী এনসিপি।
এই নির্বাচনে জামায়াত জোটের প্রার্থীদের বিএনপির সঙ্গে লড়াইয়ে বড় ব্যবধানে জয় আর জাতীয় পার্টি আসনশুন্য অবস্থান আগামীতে রংপুর অঞ্চলের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কেউ কেউ মনে করছেন, এবার রংপুরের জনগণ আবেগের লাঙ্গল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বিএনপির সঙ্গে। তবে উন্নয়ন-বৈষম্য থেকে বের হতে না পারলে আবারও পিছিয়ে যাবে তিস্তা নদীবেষ্টিত কৃষিনির্ভর রংপুর অঞ্চলের মানুষেরা।
এদিকে, ভোটের দিন বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে কোথাও দেখা যায়নি। মাঠে ছিলেন না জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারাও। অনেকের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি বক্তব্য।
জিএম কাদের নিজেও বের হননি রংপুরের সেনপাড়ার স্কাই ভিউ নিবাস থেকে। এমনকি সাংবাদিকরা তার বাসার সামনে কয়েক দফায় জড়ো হলেও তিনি গণমাধ্যমের সামনে আসেননি। তবে, একটি সূত্র জানিয়েছে, জিএম কাদের শুক্রবার সকালে গোপনেই রংপুর থেকে ঢাকায় চলে গেছেন।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: