নারীদের গায়ে হাত দিয়ে আপনারা নিজেদের কবর রচনা করছেন:ডা. শফিকুর রহমান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত:
৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:০১ পিএম
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা একদিকে বলছেন ফ্যামিলি কার্ড দেবেন, অন্যদিকে মায়েদের গায়ে হাত দিচ্ছেন। ক্ষমতায় গেলে মায়েদের সঙ্গে কী আচরণ করবেন, তা এখনই বোঝা যাচ্ছে—- ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’; সকালের সূর্য দিনটা কেমন হবে, তা বলে দেয়।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা মজলুম ছিলেন, তারা কেন জালিমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন? মেয়েদের ওপর আঘাত এ জাতি মেনে নেবে না। দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের ভোট চাওয়ার অধিকার আছে- তাতে বাধা দেবেন না। আপনি আপনার আদর্শ নিয়ে যান, আমরা বাধা দেব না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়া জাতি সহ্য করেনি- গর্জে উঠেছিল। নারীদের গায়ে হাত দিয়ে আপনারা নিজেদের কবর রচনা করছেন। মেয়েদের গায়ে হাত দেবেন না। মেয়েদের অপমান করবেন না। যারা নারীদের সম্মান করতে পারে না, তাদের কাছে একজন নারীও নিরাপদ নয়। বর্তমানে সব শ্রেণি-পেশার নারীদের নিরাপত্তার জন্য ১১ দলীয় জোটকে বেছে নিতে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
আজ ৩০ জানুয়ারি (জুমআ বার) বিকেলে লক্ষ্মীপুর জেলা শহরের আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের এক জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, জুলাইকে আমরা কবুল করে নিয়েছি। জুলাই হয়েছে বলেই আমরা এখানে এসে কথা বলতে পারছি। জুলাই হয়েছে বলেই ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হচ্ছে। এই পরিবর্তন এসেছে আমাদের সন্তানদের নেতৃত্বে। অনেকে তাদের স্বীকার করতে চান না। আমি লজ্জিত- যাদের কারণে অনেকে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে, যাদের কারণে অনেকে দেশে ফিরে এসেছে, যাদের কারণে নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে, যাদের কারণে কেউ কেউ দেশ শাসনের স্বপ্ন দেখছে- তারাই আবার তাদের অস্বীকার করে। লজ্জা! লজ্জা! এটা মেনে নেওয়া যায় না।
তিনি বলেন, যে উপকারীর উপকার স্বীকার করে না, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না, সে ভালো মানুষ হতে পারে না। দেশবাসী রাজনীতির পুরোনো বন্দোবস্ত দেখেছে। পুরোনো বন্দোবস্ত ফ্যাসিবাদ তৈরি করেছে, মানুষের অধিকার হরণ করেছে, দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছে। চাঁদাবাজিতে জনগণকে অতিষ্ঠ করেছে, জনগণের কেনা গুলিতে জনগণের বুকে বুকে গুলি ছুড়েছে। যে রাজনীতি আমার মা-বোনের ইজ্জত হরণ করেছে, সেই রাজনীতি আপনারা আবার চান? ব্যাংক ডাকাতি করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে—আপনারা সেই বাংলাদেশ আবার চান?
আমীরে জামায়াত বলেন, পরিবর্তন চাইলে ‘হ্যাঁ’ ভোটে সিল মারতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। জুলাই বিপ্লবের পর আমরা বলেছিলাম- চাঁদাবাজি করব না, মামলা বাণিজ্য করব না, মানুষের অধিকার হরণ করব না। আমরা বিজয়ী হলেও কথা রাখব ইনশাআল্লাহ। আমরা জাতিকে বিভক্ত হতে দেব না। আমরা পুরোনো কাসুন্দি নিয়ে কামড়াকামড়ি করব না। আমরা পেছনের দিকে দৌঁড়াব না। যুবকদের আমরা তোমাদের হাতে বেকার ভাতা দেব না, তোমাদের প্রত্যেকের হাতে সম্মানের কাজ তুলে দেব। আমরা বাংলাদেশের নেতৃত্ব যুবকদের হাতে তুলে দেব ইনশাআল্লাহ। তোমরা প্রস্তুত হয়ে যাও। আমাদের ১১ দলীয় ঐক্যের ৬২ শতাংশ প্রার্থী যুবক। এ দেশ হবে আগামীতে যুবকদের বাংলাদেশ।
আমরা মায়েদের বলব, আপনার যাকে ইচ্ছা তাকে ভোট দেবেন। তাদের বলবেন, ১২ তারিখ আমি ভোট দিতে যাব- পারলে ঠেকাও। যে মায়েরা শরীফ ওসমান হাদীর জন্ম দেয়, যে মায়েরা আবরার ফাহাদের মতো সন্তানের জন্ম দেয়- সেই মায়েদের ওপর হামলা করবেন না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনো প্রার্থী যদি আইন লঙ্ঘন করে থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন আছে এবং সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা আছেন- তাদের জানান। তারাই ব্যবস্থা নেবেন। আপনি হামলা করার কে? জায়গায় জায়গায় হামলা শুরু হয়েছে। ঢাকার বুকে আমাদের এই বিপ্লবের প্রতীক শরীফ ওসমান হাদীকে হত্যা করা হয়েছে। শেরপুরে আমাদের উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করে কারও গতি থামানো যাবে না। যে দলের নেতারা হাসতে হাসতে ফাঁসির তক্তার ওপর দাঁড়াতে পারে, তাদের কোনোভাবেই থামানো যাবে না। আমরা যুবক-যুবতীদের কথা দিয়েছি- জীবন দিয়ে হলেও তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কাজ করে যাব।
তিনি বলেন, এখানে ডাক্তার ফয়েজ আহমেদকে নির্যাতন করে বাড়ির ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছিল। তার অপরাধ কী ছিল? তিনি তো গরিবের ডাক্তার ছিলেন। লক্ষ্মীপুর এক দিক দিয়ে অনন্য। অসংখ্য খ্যাতনামা বিশিষ্ট ব্যক্তি ও জাতির রাহবারের জন্ম হয়েছে এই লক্ষ্মীপুরে। আমরা কুরআনের কথা বলি, ন্যায়-ইনসাফের কথা বলি। কারও ভালো লাগুক বা না লাগুক, আমরা কথা বলেই যাব।
তিনি কওমি মাদ্রাসা প্রসঙ্গে বলেন, কেউ কেউ বলে- আমরা কওমি শিক্ষা বন্ধ করে দিতে চাই। এরা মিথ্যাবাদী। কওমি মাদ্রাসা আমাদের কলিজা। এরাই দেশে ইসলামের শিক্ষাকে ধরে রেখেছে। তারা আরও বলে- আমরা নাকি নারীদের ঘরে বন্দী করে রাখব। না, নারীরা তাদের স্বাধীন ইচ্ছামতো কাজ করতে পারবে। রাসূল (সা.) মদিনা রাষ্ট্রে ইহুদিদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। যতদিন তারা চুক্তি মেনেছিল, ততদিন শান্তিতে ছিল।
তিনি বলেন, মাঝে মাঝে ভূতুম পেঁচা এসে আমাদের বাগানের ফুল নষ্ট করতে চায়। ইনশাআল্লাহ, সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে নিয়ে আমরা চলব। এখানে সবাই সমানভাবে বসবাস করবে। নিজের ধর্ম পালন করবে, সব ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিরাপদে পালন করা হবে। কেউ তাদের বাধা দিতে পারবে না।
তিনি ফ্যাসিস্টদের বিচার প্রসঙ্গে বলেন, যারা অতীতে আমাদের ওপর অন্যায় করেছে, আমরা তার বিচার করব। তারা অপকর্ম করে আমাদের ঘাড়ে দোষ দিয়েছে। আমরা তাদের খুঁজে বের করে বিচার করব। আল্লাহ তায়ালাকে সাক্ষী রেখে বলতে চাই- আমরা এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না।
তিনি লক্ষ্মীপুরবাসীর দাবি-দাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আপনাদের সব দাবি যুক্তিসংগত। আরেকটি দাবি আমি বলছি- এটা আপনারা করেননি। এশিয়ার বৃহৎ মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র ছিল লক্ষ্মীপুরে। চুরি করে লুটপাট করে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা এটিকে পুনরুজ্জীবিত করব। একটি একটি করে সব দাবি আপনাদের সঙ্গে বসে পূরণ করা হবে।
মেঘনা নদীর বাঁধ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- বাজেট আসে, পেটের ভেতর চলে যায়, নদীর পাড়ে যায় না। আমি সেই বাজেট নদীর পাড়ে নিয়ে যাব। অতীতে যারা দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করেছে, সেই সম্পদ পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা হবে ইনশাআল্লাহ।
ন্যায্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের উন্নয়ন করা হবে। কারও প্রতি বৈষম্য করা হবে না। প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি কোথায়, সেটা দেখা হবে না। যে এলাকা বেশি অবহেলিত, সেটি আগে উন্নয়ন করা হবে। বিচারের ব্যাপারে আমাদের কথা পরিষ্কার। শিশু থেকে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা- সবার জন্য ন্যায্য বিচার কায়েম করতে চাই। যে অপরাধে দেশের জনগণকে শাস্তি দেওয়া হবে, সেই একই অপরাধ করলে রাষ্ট্রপতিকেও ছাড় দেওয়া হবে না। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এগুলোকে যারা ভয় করে, তারা মানুষের গণজোয়ারকেও ভয় করে।
ইনশাআল্লাহ, ১১ দলের যাদের যেখানে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে, তাদের বিজয়ের মাধ্যমে জনগণের সরকার কায়েম করা হবে।
ভাষণের শেষাংশে তিনি বলেন, আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না—১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুরের মানুষ ইতিহাস তৈরি করবে। সেই ইতিহাস হবে ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে, বাংলাদেশকে চাঁদাবাজমুক্ত করার পক্ষে, দুর্নীতিমুক্ত করার পক্ষে এবং অর্থনৈতিক মুক্তির পক্ষে।
LIMON

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: