চার মাসে ডাকসু যেমন হয়েছে, বাংলাদেশও তেমন হবে: জামায়াত আমির
মানুষ জিজ্ঞেস করে আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে? আমরা বলি- চার মাসে ডাকসু যেমন হয়েছে, বাংলাদেশও তেমন হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টায় সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম মুকুল।
এসময় রাষ্ট্রের সকল মানুষের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ বাঁচার পরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠনের সুযোগ পেলে শপথ নেয়ার দিন থেকেই দুর্নীতি, কালো টাকা এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া হবে এবং ইনসাফ কায়েম করে প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের সরকার যেদিন শপথ নেবে, সেদিন থেকেই কেউ কালো টাকার দিকে হাত বাড়াতে পারবে না। যারা ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে, তাদের বেতন কাঠামো হবে আলাদা। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত যারা কাজ করেন আর যারা ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেন দু’জনের মজুরি সমান হওয়া চরম বে-ইনসাফি। ইনসাফ মানে সবাইকে সমান দেয়া নয়, ইনসাফ মানে প্রত্যেককে তার ন্যায্য অধিকার দেয়া।
জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্যপ্রার্থী অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ, সংসদ সদস্যপ্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, মুহাদ্দিস রবিউল বাশার, গাজী নজরুল ইসলামসহ ১১ দলীয় ঐক্যের জাতীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
সাতক্ষীরার পরিস্থিতি তুলে ধরে আমীরে জামায়াত বলেন, দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জুলুমের শিকার হয়েছে সাতক্ষীরা জেলা। তিনি বলেন, একটি জেলায় এত বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এমন নজির আর কোথাও নেই। দুনিয়ায় বিচার পাব কি না জানি না, তবে আখিরাতে অবশ্যই ইনসাফ পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ।
তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকার সাতক্ষীরাকে দেশের অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করেনি। উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে জেলাটিকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ক্ষমতায় চিরস্থায়ী থাকার মানসিকতা থেকেই তারা এ অঞ্চলের মানুষের ওপর জুলুম চালিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দেন এবং যাদের অন্যায় ও অহংকার প্রকাশ পায়, তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সাতক্ষীরার মানুষের অপরাধ ছিল তারা ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এখানকার বহু নেতাকর্মীর বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, মা-বোনদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এমনকি অনেককে প্রাণও দিতে হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
জামায়াতের নেতাকর্মীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সাতক্ষীরাসহ কোথাও আমাদের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা মামলাবাজিতে জড়ায়নি। আমরা আমাদের ভাইদের ক্ষমা করতে বলেছি। তবে কেউ ন্যায়বিচার চাইলে আমরা তার পাশে দাঁড়াব। তিনি বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হাজার হাজার মানুষকে আসামি করে মামলা দেয়া হচ্ছে, যা মানুষের সঙ্গে বাণিজ্য ও হয়রানির শামিল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাতক্ষীরার সঙ্গে সৎ মায়ের মতো আচরণ করা হয়েছে। জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, একটি দ্বীনদার ও ইনসাফভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সাতক্ষীরার আসনগুলো জামায়াতকে উপহার দিতে হবে। সরকার গঠনের সুযোগ পেলে জনগণের ঋণ পরিশোধ, সমস্যা সমাধান এবং জনগণের সম্পদ লুটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করে বলেন, লুট হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা উদ্ধার করা হবে।
আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণ এবার দুটি ভোট দেবে একটি জুলুম ও বস্তাপচা রাজনীতির বিরুদ্ধে এবং আরেকটি মা-বোনদের সম্মান ও নিরাপত্তার পক্ষে। তিনি বলেন, দেশের যুবসমাজ পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধির প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পাঁচটি সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তা জানিয়ে দিয়েছে। এক ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করা হলে সে বলেছে, ‘আমরা গর্ববোধ করছি’ কারণ শিবির আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। মানুষ জিজ্ঞেস করে- আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে? আমরা বলি- চার মাসে ডাকসু যেমন হয়েছে, বাংলাদেশও তেমন হবে।
নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি বলেন, ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে মা-বোনদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। দ্বিচারিতা ও ভণ্ডামি জনগণ আর মেনে নেবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে, তবে কোনো রাষ্ট্রকে প্রভুর মতো আচরণ করতে দেয়া হবে না। আমাদের প্রভু একজনই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।
দ্রব্যমূল্য প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের কারণেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সরকার গঠনের পর কঠোর হাতে এসব দমন করা হবে বলে তিনি জানান।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের রোজার ঈদে সাতক্ষীরা এসে তিনি শহিদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। মা-বোনদের চোখের জল ও কষ্ট তিনি কোনো দিন ভুলতে পারবেন না বলে আবেগঘন কণ্ঠে উল্লেখ করেন।
সবশেষে তিনি বলেন, ইনসাফের ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়াই জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্য। সকল মত ও পথের মানুষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: