‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নামে গৌণ ইস্যুকে মুখ্য করে সময়ক্ষেপণ জনমনে ভুল বার্তা দেয়’

প্রকাশিত: ১৯ মার্চ ২০২৫ ২১:০৩ পিএম

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেছেন, জনপ্রত্যাশার প্রতি শ্রদ্ধা না দেখিয়ে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নামে গৌণ ইস্যুকে মুখ্য করে অকারণ সময় ক্ষেপণের চেষ্টা হলে সেটি জনমনে ভুল বার্তা পৌঁছাবে।

রাজনৈতিক নেতাদের সম্মানে আজ বুধবার ঢাকা লেডিস ক্লাবে বিএনপি আয়োজিত ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, 'গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণে দেশের শুধু শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতি এ সবকিছু ধ্বংস হয়নি, বরং বাংলাদেশের আবহমানকালের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকেও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সমাজে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে ঘৃণার বিষবাষ্প, বিনষ্ট করে দেওয়া হয়েছে সামাজিক সম্প্রীতি, ভাতৃত্বের বন্ধন।'

'একটি রাষ্ট্র ও সমাজের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক সম্প্রীতি ও মূল্যবোধ যদি বিনষ্ট করে দেওয়া যায়, তখনই সমাজব্যবস্থা অবক্ষয়, ভঙ্গুর, নিষ্ঠুর ও অমানবিক হয়ে ওঠে। ভঙ্গুর রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা উগ্রবাদ আর চরমপন্থা বিকাশের এক উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়,' বলেন তিনি।

'সম্প্রতি হঠাৎ করেই অতীতের মতো দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে' মন্তব্য করে তারেক বলেন, 'দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের নিরাপত্তাহীন রেখে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। সরকার, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি কিংবা অন্য কোনো কাজে হয়ত বেশি মনোযোগী থাকার কারণে, আমাদের নারীরা নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে কিনা, এ বিষয়টি গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন আছে।'

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, 'ধর্মীয় উগ্রবাদীদের অপতৎপরতা এবং চরমপন্থা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিলে উগ্রবাদী জনগোষ্ঠী এবং পরাজিত ফ্যাসিবাদী অপশক্তি দেশে পুনরায় গণতন্ত্রের কবর রচনা করবে। অপরদিকে গণতান্ত্রিক বিশ্বে ইমেজ সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ।'

'দেশের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চরিত্র সমুন্নত রাখতে চরমপন্থা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদী অপশক্তিকে প্রতিহত করার পাশাপাশি গণহত্যাকারী পলাতক মাফিয়া চক্রকে যেকোনো মূল্যে বিচারের সম্মুখীন করার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করাই হবে বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির আগামী দিনের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত,' বলেন তিনি।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আরও বলেন, 'গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জুলাই-আগস্টে বীর জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে পলাতক মাফিয়া চক্রের পতনের পর সাত মাস পার হয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশক মাফিয়া শাসন-শোষণে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সাত মাস হয়ত খুব বেশি সময় নয়।'

'তবে আগামী দিনগুলোতে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম কিংবা কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা জনগণের সামনে আরও স্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট হলে জনমনে থাকা সকল সন্দেহ সংশয়ের অবসান ঘটত,' যোগ করেন তিনি।

'শুধু একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যই মাফিয়া সরকারের পতন ঘটেনি—একথা যেমন সত্য। তার চেয়েও আরও চরম সত্য হয়ত একটি সুষ্ঠ নিরপেক্ষ নির্বাচন না করার জন্যই কিন্তু মাফিয়া সরকারের নির্মম পতন হয়েছিল। সুতরাং একটি নির্বাচনকে শুধুমাত্র কোনো একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়ার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার অবকাশ নেই,' বলেন তারেক রহমান।

তিনি বলেন, 'প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে জনগণ যার যার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার সুযোগ পান। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদ ও সরকার গঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সর্বোপরি প্রতিটি সফল ও কার্যকর নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চুক্তি নবায়িত হয়। রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের মালিকানার সম্পর্ক গভীরতর হয়।'

তিনি বলেন, 'রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয় সোচ্চার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টা, এমনকি দুয়েকটি রাজনৈতিক দলকেও জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে ইদানিং কিছুটা ভিন্ন স্বরে কথা বলতে শোনা যায়।'

তিনি বলেন, 'আমরা মনে করি জনপ্রত্যাশার প্রতি শ্রদ্ধা না দেখিয়ে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নামে গৌণ ইস্যুকে মুখ্য করে অকারণ সময় ক্ষেপণের চেষ্টা হলে সেটি জনমনে ভুল বার্তা পৌঁছাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা এবং সরকারের কার্যক্রমের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট সৃষ্টি হলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথ বিপদসংকুল হয়ে উঠতে বাধ্য। অপরদিকে এ ধরনের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত পলাতক মাফিয়া চক্রের দোসরদের পুনরুত্থানের পথকেই সুগম করবে।'

উপস্থিত নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'আপনাদের অনেকের সঙ্গেই পরামর্শ করেই রাষ্ট্র রাজনীতি মেরামতের লক্ষ্যে আজ থেকে প্রায় দুই বছর আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জনগণের সামনে ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি উপস্থাপন করেছিল। ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে বর্তমানে বিএনপি সারাদেশে বিভিন্ন স্তরের জনগণের সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত রেখেছে।'

'তবে আমরা আগেও বলেছি আজও আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই যে, এই ৩১ দফাই চূড়ান্ত নয়। এই ৩১ দফাতেও প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজনের সুযোগ রয়েছে। বিএনপিসহ প্রতিটি রাজনৈতিক দল মনে করে সংস্কার ও নির্বাচন উভয়টি প্রয়োজন। সুতরাং সংস্কার ও নির্বাচনকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর কোনোই প্রয়োজন নেই,' বলেন তিনি।

তারেক রহমান আরও বলেন, 'রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নীতি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী এবং কার্যকর করার উপায় শুধুমাত্র কেতাবি সংস্কারের ওপর নির্ভর করে না। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নীতি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হয় প্রতিদিনের গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর। বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদরাই রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা করেন।'

তিনি বলেন, 'সুতরাং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং গণতান্ত্রিকামী জনগণের বিচার বুদ্ধির ওপর আস্থাহীনতার প্রয়াস শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থাকে দুর্বল ও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।'

তারেক রহমান বলেন, 'একটি রাষ্ট্রের একটি সরকারের মেয়াদ নির্দিষ্ট কিন্তু দেশের রাজনৈতিক নীতি কিংবা রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা দীর্ঘস্থায়ী দীর্ঘমেয়াদী। সুতরাং রাজনৈতিক পরিক্রমা প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী এবং টেকসই কার্যকর রাখতে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন জনগণ এবার নিজেদের ভোটের অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সরকার প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে প্রস্তুত।'

'সুতরাং জননিরাপত্তা নিশ্চিত ও দুর্ভোগ কমানোর সব ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি জনগণের ভোট জনগণের কাছে দিয়ে দায়বদ্ধ একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে—এটি গণতান্ত্রিক জনগণের প্রত্যাশা,' বলেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, 'বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রজন্মদের জন্য একটি বৈষম্যহীন নিরাপদ গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি নির্বাচিত জাতীয় সরকারের মাধ্যমে বিএনপি রাষ্ট্র ও রাজনীতি মেরামতের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য পূরণে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জনগণের রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে, গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয় জাতীয় সরকার গঠন করবে, যা অতীতেও আমরা জাতির সামনে কমিট করেছি।'

'গণতন্ত্রকামী জনগণের প্রতি আহ্বান, বীর জনতার গণঅভ্যুত্থানে হাজারো শহীদের রক্তের রঞ্জিত রাজপথে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যবিরোধী ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে এখনো। আমরা যদি সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকি, স্বাধীনতাপ্রিয় গণতান্ত্রিক জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে, কোনো ষড়যন্ত্রই কোনো কাজে আসবে না ইনশাআল্লাহ,' বলেন তিনি।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর