১৮০ দিনে সরকারের দাবি অর্জনের, সামনে বাস্তবায়নের পরীক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৪ আগষ্ট ২০২৬ ১১:০৮ এএম

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাস বা ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এ সময়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ, সংস্কার ও অর্জনের তথ্য তুলে ধরে ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ৪৬ পৃষ্ঠার একটি ই-বুক প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং। অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, পররাষ্ট্রনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের কার্যক্রমের বিবরণ রয়েছে এতে।

সরকারের ভাষ্য, ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসন ও বিভিন্ন খাতের সংকটের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তাই প্রথম ১৮০ দিনকে শুধু অর্জনের সময় নয়, রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামো পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার ভিত্তি তৈরির সময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ই-বুকে, ছয় মাসে প্রতিটি ক্ষেত্রে শতভাগ সফলতার দাবি করা হচ্ছে না। ফলে এখন বড় প্রশ্ন- ঘোষিত উদ্যোগগুলো কত দ্রুত ও কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।

ইশতেহার বাস্তবায়নে নানা উদ্যোগ


সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো কর্মসূচি তুলে ধরা হয়েছে।

ই-বুকের তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক পরিবার উপকৃত হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়াতে ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষক, প্রবাসী, স্বাস্থ্য ও ফ্রিল্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরনের কার্ড চালুর উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।

অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার দাবি
১৮০ দিনের মূল্যায়নে অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। মূল্যস্ফীতি কমানো, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে কর কমানো, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণ, ব্যবসায়িক লাইসেন্স নবায়ন সহজ করা এবং দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানানো হয়েছে।

 

তবে, অর্থনীতিতে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের গতি বাড়ানো। অর্থনৈতিক সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব কতটা পড়ছে, আগামী দিনের মূল্যায়নে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

 

সামাজিক নিরাপত্তায় নতুন কর্মসূচি
জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সামনে রেখে বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির কথা তুলে ধরা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পাওনা পরিশোধের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতেও নানা পরিকল্পনার কথা রয়েছে। সরকার জানিয়েছে, অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের পাওনা বাবদ শিক্ষকদের ২ হাজার কোটি টাকার চেক দেওয়া হয়েছে।

 

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা বাড়ানো, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা এবং দুরারোগ্য রোগে আক্রান্তদের আর্থিক সহায়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন বিষয় যুক্ত করা, বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই, শিক্ষার্থীদের পোশাক ও ব্যাগ এবং মিড-ডে মিল চালুর উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ও তৃতীয় ভাষা শিক্ষার পরিকল্পনাও রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা এখনো বড় পরীক্ষা
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করা হলেও এই খাতই সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষার জায়গা। পুলিশ ও প্রশাসনকে রাজনৈতিক হয়রানিমুক্ত ও জনবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।

 

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর দখলমুক্ত করা, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ গুরুতর অপরাধের দ্রুত বিচার এবং পুরোনো আলোচিত মামলার তদন্তে অগ্রগতির কথাও ই-বুকে উল্লেখ করা হয়েছে। তনু হত্যা ও শহীদ ওসমান হাদী হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার এক আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ও অর্জনের তালিকায় রাখা হয়েছে।

তবে গণপিটুনি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা এখনো অনেক বেশি। ফলে কাগজে-কলমের উদ্যোগের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তার বাস্তব চিত্র কতটা বদলায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

 

রাজনীতিতে ‘গুণগত পরিবর্তনের’ দাবি
ই-বুকের উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে রয়েছে রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি। প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে ধৈর্য ও সহনশীলতার রাজনীতির পথে হাঁটার কথা বলা হয়েছে।

ব্যক্তিবন্দনার রাজনীতি বন্ধের উদ্যোগ হিসেবে সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠানের ব্যানার-ফেস্টুনে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার বন্ধ এবং সরকারি অফিস, আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় নেতার ছবি টাঙানোর সংস্কৃতি বন্ধের কথা বলা হয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রীর চলাফেরায় প্রটোকল কমানো, গাড়িবহরে বাড়তি আনুষ্ঠানিকতা না রাখা এবং অধিকাংশ মন্ত্রী-উপদেষ্টার গাড়িবহর থেকে পুলিশ প্রটোকল সরিয়ে নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে দেখছে সরকার।

তবে পরিবর্তনগুলো কতটা দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয়।

 

পরিবহন ও অবকাঠামোয় পরিকল্পনা
ঢাকার যানজট কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর কথা বলা হয়েছে। নারীদের জন্য পিংক বাস, ঢাকায় ২০০টি বৈদ্যুতিক বাস নামানোর উদ্যোগ এবং পরিবহন খাতে বিদ্যুতায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।

রেল খাতে অচল ডেমু ট্রেন সচল, নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু এবং দীর্ঘমেয়াদে বুলেট ট্রেন সংযোগের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারেজ ও বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডোর নিয়েও অগ্রগতির কথা জানিয়েছে সরকার।

 

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতি
পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সরকারের মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর চীন ও মালয়েশিয়া সফর, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়ার বিষয়কে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও রয়েছে।

 

১৮০ দিনের পর আসল পরীক্ষা
সরকারের ই-বুকে ১৮০ দিনের বিভিন্ন উদ্যোগ ও অর্জনের বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া হলেও এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- এসব উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, ‍“সরকারের ছয় মাসের অঙ্গীকারের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে।” 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোথাও শতভাগ বাস্তবায়ন না হলেও সামগ্রিকভাবে অগ্রগতি হয়েছে এবং পরবর্তী ছয় মাসে কর্মসূচি আরো দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।

রিজভী বলেন, “ছয় মাসের যে লক্ষ্য, সে লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সবগুলোই পূরণ হয়েছে। কোথাও হয়তো ১০০ শতাংশ না হলেও সেখানে ৯৫ শতাংশ, ৯০ শতাংশ আছে। কোথাও ১০০ শতাংশ হয়েছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিতে সময় লেগেছে। ”

জানতে চাইলে বিএনপির আরেক যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে তাদের যে ইতিবাচক ভূমিকা, সেটি অবশ্যই উল্লেখ করার মতো। নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের ইশতেহারের মাধ্যমে এবং বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বিভিন্ন বক্তব্যে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা থেকে দেশকে বের করে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে নেওয়ার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, তার প্রতিফলন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডে আমরা দেখতে পেয়েছি।”

তিনি বলেন, “আমি মনে করি, সরকারের এই কর্মকাণ্ড আরো গতিশীল হতে পারত। বিশেষ করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের যে প্রভাব ও অনুগত অংশ এখনো রয়ে গেছে, তারা সরকারের অনেক ইতিবাচক উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। এ কারণে সরকারের কিছু কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তারপরও গত ১৮০ দিনে জনগণের মূল্যায়নে বিএনপি সরকারের কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়েছে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা এবং দেশের উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার যে ইতিবাচক ধারায় কাজ করছে, তার প্রতিফলন এই ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।”

বিএনপির এই নেতা বলেন, “আমি মনে করি, সামনে প্রশাসনকে আরো কার্যকর ও গতিশীল করে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি বাংলাদেশকে গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের পথে আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।”

LIMON

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর