হাসনাত আব্দুল্লাহর ফেসবুক পোস্টের জবাবে যা বলেছে সেনা সদর
আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২৫ ৩:০২ পিএম

আওয়ামী লীগকে “ক্যান্টনমেন্ট” থেকে পুনর্বাসন চেষ্টার অভিযোগ এনে জাতীয় নাগরিক পার্টির সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহর দেয়া ফেসবুক পোস্টের প্রেক্ষিতে জবাব দিয়েছে সেনাবাহিনী সদর দপ্তর।
আওয়ামী লীগের ‘সংশোধিত’ একটি পক্ষের রাজনৈতিক পুনর্বাসনে রাজি হতে সেনানিবাস থেকে চাপ পাওয়ার বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ যে দাবি করেছেন, তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সেনাবাহিনী সদর দপ্তর।
শনিবার নেত্র নিউজকে দেয়া সেনাসদরের এক বিবৃতিতে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে যে সেনানিবাসে খোদ সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গেই ১১ মার্চ বৈঠকটি হয়েছিল। তবে হাসনাত আব্দুল্লাহকে “ডেকে নিয়ে যাওয়া এবং আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিষয় নিয়ে তাদেরকে প্রস্তাব বা চাপ প্রয়োগে”র অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। বরং হাসনাত আব্দুল্লাহ ও তার দলের আরেক মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলমের আগ্রহেই ওই বৈঠকটি হয়েছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে নতুন রূপে পুনর্বাসনের বিষয়ে সেনানিবাসের কাছ থেকে “ভারতের পরিকল্পনা” উপস্থাপন করা হয়েছে — শুক্রবার হাসনাত আব্দুল্লাহর এমন ফেসবুক পোস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনার সৃষ্টি হয়।
এরই প্রেক্ষিতে নেত্র নিউজ যোগাযোগ করলে একজন মুখপাত্রের মাধ্যমে বক্তব্য দেয় সেনাসদর। হাসনাত আব্দুল্লাহর পোস্টকে “সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি বৈ অন্য কিছু নয়” বলেও মন্তব্য করা হয়েছে সেনা সদরের বিবৃতিতে। এছাড়া ২৭ বছর বয়সী এই ছাত্রনেতার বক্তব্যকে “অত্যন্ত হাস্যকর ও অপরিপক্ক গল্পের সম্ভার” হিসেবেও আখ্যা দিয়েছে সেনাবাহিনী।
বাংলাদেশে আগস্টে যেই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল, তার সূচনা ঘটেছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মাধ্যমে। পরবর্তীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠিত হলে হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত নতুন অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের মন্ত্রীসভায় ওই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত তিন জন ছাত্রনেতা দায়িত্ব পালন করেন। তাদেরই একজন নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি নামে একটি নতুন দলের আহবায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই দলে দুই আঞ্চলিক মুখ্য সমন্বয়কের পদ পান হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম।
শুক্রবার এক ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আব্দুল্লাহ দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিন ও ঢাকার মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে সামনে রেখে “‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নামে নতুন একটি ষড়যন্ত্র নিয়ে আসার পরিকল্পনা চলছে।”
সুনির্দিষ্টভাবে তিনি বলেন, সেনানিবাস থেকে ১১ই মার্চ দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে এক বৈঠকে তাদেরকে এই নয়া আওয়ামী লীগকে মেনে নিতে সমঝোতা ও সংসদের আসন ভাগাভাগির প্রস্তাব দেয়া হয়।
তার পোস্টের পর ওই রাতেই জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। সেখানে নেত্র নিউজের একজন প্রতিবেদক হাসনাত আব্দুল্লাহকে প্রশ্ন করেন, সেনানিবাসে তিনি যে বৈঠকটির কথা বলছেন, তা কি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে হয়েছিল কিনা। কিন্তু এই বিষয়ে তিনি সরাসরি জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান।
হাসনাত বলেন, “আমিতো সেখানে ‘ক্যান্টনমেন্ট’ উল্লেখ করেছি, আপনারা কথা বলতে পারেন সেখানে।”
আরেকজন সাংবাদিক তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন কার উদ্যোগে বৈঠকটি হয়েছিল। জবাবে হাসনাত বলেন, সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ও বিদ্যমান আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন ছিল। এসব বিষয়ে “কথা বলার জন্য আমাদেরকে আহ্বান জানানো হয়েছিল।”
সংবাদ সম্মেলনের পর নেত্র নিউজের একজন প্রতিবেদক আবারও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি “বাইনারি” বা হ্যাঁ-না জবাব দিতে রাজি হননি।
অপরদিকে নেত্র নিউজকে পাঠানো বিবৃতিতে সেনাসদর নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে সেনাপ্রধানের সঙ্গেই ওই বৈঠকটি হয়েছিল; তবে ওই বৈঠক ছাত্রনেতাদের আগ্রহেই হয়েছিল বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, “হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং সারজিস আলম দীর্ঘদিন যাবৎ সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য ইচ্ছা পোষণ করছিলেন। পরবর্তীতে সারজিস আলম ১১ই মার্চ ২০২৫ তারিখে সেনাপ্রধানের মিলিটারি এডভাইজারকে ফোন দিয়ে সেনাপ্রধানের সাথে সাক্ষাতের জন্য সময় চান। এর প্রেক্ষিতে মিলিটারি এডভাইজার তাদেরকে সেনাসদরে আসার জন্য বলেন।”
“অতঃপর ১১ই মার্চ দুপুরে সারজিস আলম এবং হাসনাত আব্দুল্লাহ সেনাসদরে না এসে সরাসরি সেনাভবনে সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করেন। পরবর্তীতে সেনাপ্রধান অফিস কার্যক্রম শেষ করে সেনা ভবনে এসে তাদের সঙ্গে দেখা করেন।”
সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল, তা নেত্র নিউজ স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিটের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পৃথকভাবে নেত্র নিউজকে বলেছেন যে, ছাত্রনেতাদের আগ্রহ ও উদ্যোগেই ওই বৈঠকটি হয়েছিল।
সেক্ষেত্রে হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলমের এই বৈঠক তাদের ব্যক্তিগত আগ্রহে নাকি জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে পুর্বানোমোদিত ছিল, তা স্পষ্ট নয়।
তবে শনিবার সিলেটে এক ইফতার মাহফিলে দলটির আরেক নেতা নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী সহকর্মী হাসনাতের ওই ফেসবুক পোস্টকে “শিষ্টাচার বর্জিত” হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই বিষয়ে দলটির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম ও সরজিস আলমের বক্তব্য চেয়েছে নেত্র নিউজ। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের জবাব পাওয়া যায়নি।
হাসনাত, সারজিস ও নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী — সকলেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী কিংবা সেনাপ্রধানের সঙ্গে দূরত্ব বা রেষারেষির নেই উল্লেখ করে বক্তব্য দিয়েছেন।
সৌজন্যেঃ নেত্র নিউজ
এআরএস
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: