বাংলাদেশের নির্বাচন-পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র গণভোট
বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ দেশের মানুষ জুলাই বিপ্লবের পর তৈরি হওয়া সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সংস্কারের প্রতি সম্মতি দিয়েছেন। কিন্তু এ জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে সরকারি দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। এখন এ গণভোট বাংলাদেশে নির্বাচন-পরবর্তী বড় সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
গণভোট কী নিয়ে ছিল, কেন এটি নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলো এবং পরবর্তী সময়ে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপির সংসদ সদস্যরা গত মঙ্গলবার এমপি হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। এ একটা পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে, যা সংস্কারের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। প্রতিবাদ তীব্র হলে শেখ হাসিনা কঠোর দমন-পীড়নের নির্দেশ দেন।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, এতে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহত এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আদালত হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান এবং বর্তমানে সেখানেই নির্বাসনে আছেন। বাংলাদেশে তার দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। সাম্প্রতিক নির্বাচনটি ছিল সে গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন।
জুলাই সনদ কী হাসিনার পলায়নের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ প্রণয়ন করে। এতে সংবিধান সংশোধন, আইন পরিবর্তন এবং নতুন আইন প্রণয়নের একটি রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
এ চার্টারে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের লক্ষ্যে ৮০টিরও বেশি প্রস্তাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র ও নির্বাচন সহায়তা সংস্থার (আইডিয়া) মতে, প্রধান সংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছেÑনারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুরক্ষা। সনদে বর্তমান একক আইনসভা—৩৫০ সদস্যের জাতীয় সংসদের পাশাপাশি ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠনের সুপারিশও করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপি কয়েক মাস ধরে জুলাই সনদের ওপর গণভোট বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিল এবং কখনো কখনো ‘না’ ভোট দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল। তবে ৩০ জানুয়ারি দলীয় নেতা তারেক রহমান (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সমর্থন জানান। সে সময় তিনি ঘোষণা দেন, গণভোটে অনুমোদিত হলে বিএনপি সনদটি গ্রহণ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ করে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি ব্যবহারের প্রস্তাবের বিরোধিতা করছিল বিএনপি। তাদের যুক্তি ছিল, এতে বর্তমান নির্বাচনি ব্যবস্থায় বড় দলগুলোর সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দুর্বল হতে পারে।
এখন যেহেতু চার্টারটি অনুমোদিত হয়েছে, নতুন সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে, যা সনদে উল্লিখিত সংবিধান সংশোধন কার্যকর করবে। পরিষদ গঠনের পর ১৮০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা গত মঙ্গলবার শপথ নেন। তাদের দুটি শপথ নিতে বলা হয়। প্রথমটি ছিল বাংলাদেশের সংবিধান সমুন্নত রাখার প্রচলিত অঙ্গীকার। দ্বিতীয়টি ছিল জুলাই সনদকে সম্মান ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার। তবে বিএনপির এমপিরা দ্বিতীয় শপথ নেননি।
এরপর জামায়াত ও তাদের মিত্র এনসিপি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। প্রথমে তারা শপথ বর্জন করার হুমকি দেয়। পরে যদিও তারা দুটি শপথ নেন।
বর্তমানে কেবল জামায়াত, এনসিপি এবং অল্প কয়েকজন সদস্য, যারা দ্বিতীয় শপথ নিয়েছেন, তারাই পরিষদে বসার যোগ্য। যেহেতু দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংসদ সদস্য দ্বিতীয় শপথ নেননি, তাই এখনো পরিষদ গঠন করা সম্ভব হয়নি। পরিষদ গঠন নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান বলেন, এ গণভোট আগামী দিনে বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে একটি বড় বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। বিরোধের মূল বিষয় হবে সংস্কারগুলো কীভাবে, কখন এবং কতটুকু বাস্তবায়ন করা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও এমপি সালাহউদ্দিন আহমদ শপথ অনুষ্ঠানের আগে গণমাধ্যমকে জানান, আমাদের কেউই এ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি। এ পরিষদ এখনো সংবিধানের অংশ নয়। নির্বাচিত সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হলেই এটি বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, সংস্কার নিয়ে বিএনপির প্রধান উদ্বেগ হলো প্রস্তাবিত ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষের গঠন পদ্ধতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, বড় দলগুলো গণভোটের প্রায় সব মূল বিষয়ের ওপর একমত। তবে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে, বিশেষ করে প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে। বিএনপি চায় উচ্চকক্ষ গঠিত হোক সংসদীয় আসনের অনুপাতে। কিন্তু জামায়াত ও এনসিপি চায় অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি। এ বিরোধ মীমাংসা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
জামায়াত ও এনসিপি গণভোটের ভিত্তিতে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে চাপ দিচ্ছে। তবে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার কারণে বিএনপির হাতে রয়েছে সংস্কার বাস্তবায়নের ধরন নির্ধারণ করার ম্যান্ডেট। বিএনপির যুক্তি হলো, যেকোনো কাঠামোগত পরিবর্তন স্পষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে হতে হবে, নইলে তা আদালতে বাতিল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। প্রথম যে বিষয়টি সমাধান করতে হবে, তাহলো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন। এখন পর্যন্ত বিএনপি এতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
রেজওয়ান বলেন, বিএনপির মতে সংস্কার পরিষদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নেই। তাই সংসদ নিজেই যদি আইন প্রণয়ন করে, তাহলে সংস্কার পরিষদের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। যদি সংসদ সংবিধান সংশোধন করে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন একটি পরিষদ প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে তা আইনসম্মতভাবে গঠন করা যেতে পারে। আর যদি তা না-ও করা হয়, তবুও বিদ্যমান আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সংস্কার কার্যকর করা সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, যেহেতু গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে, সেহেতু বিএনপি রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ সংস্কার বাস্তবায়ন করতে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে, কত সময়ের মধ্যে এবং কতটুকু পরিসরে এ সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে?

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: