কূটনীতিকদের সম্মানে ইফতারে জামায়াত আমির

প্রকাশিত: ০৮ মার্চ ২০২৫ ২২:০৩ পিএম

ঢাকায় নিয়োজিত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সম্মানে ইফতারের আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শনিবার রাজধানীর গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে এই ইফতার অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী সরকারের বাধার কারণে দীর্ঘ ১১ বছর পর এবার এ ধরণের আয়োজন করল দলটি। এতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান ইফতার মাহফিলে অংশ নেয়া কূটনীতিকদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন। ইফতার শেষে অতিথিদের নিয়ে নৈশভোজেও অংশ নেন জামায়াত আমির।

ইফতারের আগে দেয়া শুভেচ্ছা বক্তব্যে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি বন্ধুদের সম্মানে ইফতার আয়োজনের ঐতিহ্য ধরে রেখেছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের এসব আয়োজন করতে দেয়নি। এমনকি কিছু অনুষ্ঠানের জন্য ভেন্যু বুকিং ও অতিথিদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও, শেষ পর্যন্ত সরকারের বাধার কারণে আমাদের সেইসব আয়োজন বাতিল করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, রমজান শুধুমাত্র সিয়াম সাধনার মাস নয়, এটি আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম ও আত্মনিবেদন করার মাস। রোজা রাখার মাধ্যমে আমরা নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্ত মানুষের কষ্ট অনুধাবন করি এবং আমাদের হৃদয়ে সহমর্মিতার বীজ বপন হয়।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় থাকে। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। ৯০-এর দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। জামায়াত স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রস্তাব দেয় ও এর পক্ষে জনমত তৈরি করে।

কিন্তু গত ১৫ বছরের দুঃশাসনে আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতকে দমন করার সব ধরনের অপচেষ্টা চালিয়েছে। জামায়াতের পাঁচজন শীর্ষ নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, ছয়জন নেতাকে কারাগারে বা পুলিশের হেফাজতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে, অনেকে গুমের শিকার হয়েছেন এবং অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে গেছেন।

এই নিষ্ঠুরতার মধ্যেও জামায়াতে ইসলামী এবং এর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির জুলাই বিপ্লবে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংগঠনের নেতা-কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ যেন আর কখনো পথ হারিয়ে না ফেলে, সে জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এই সংস্কার উদ্যোগকে স্বাগত জানায় এবং এরইমধ্যে বিভিন্ন পরামর্শ ও সুপারিশ প্রদান করেছে।

বিশেষ করে, বাংলাদেশে প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) ভিত্তিক নির্বাচনব্যবস্থা চালুর পক্ষে আমরা জোরালো মতামত ব্যক্ত করেছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই ব্যবস্থা জনগণের মতামতকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করবে এবং ফ্যাসিবাদী শাসন পুনরায় ফিরে আসার পথ রুদ্ধ করবে। এ ছাড়া, লক্ষ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির দাবিও আমরা তুলে ধরেছি, কারণ তাদের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আশা করি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমাদের এই আহ্বানে সাড়া দেবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

জামায়াত আমির বলেন, আমরা মনে করি, একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক ব্যবস্থা টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। আমাদের দায়িত্ব হলো—প্রত্যেক নাগরিকের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রতিটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং দেশ গঠনে সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া। এই লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, বাংলাদেশে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু বলে কিছু নেই—এদেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকারভুক্ত। ইসলাম আমাদের শেখায় যে বৈচিত্র্য এক আশীর্বাদ, আর অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থার মাধ্যমেই আমরা ন্যায়সঙ্গত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তুলতে পারি।

ইফতার মাহফিলে সঞ্চালনা করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন, সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, মাওলানা আব্দুল হালিম, হামিদুর রহমান আজাদ, অ্যাডভোকেট অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল ও সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ প্রমুখ।

এতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মেরি মাসদুপি, চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়ো ওয়েন, রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার গিরি গোরিওভিস কোজিন, অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনার সুসান রেলি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মিকায়েল মিলার, ইরানের রাষ্ট্রদূত মানসুর চাভোশি, তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রমিস সেন, পাকিস্তানের হাইকমিশনার কামরান ধাংগল, দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত, মরক্কো, নেদারল্যা-স, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ভারত, ভুটান, সিঙ্গাপুর, ব্রুনেই, ডেনমার্ক, মালয়েশিয়া, ইরাক, ভ্যাটিকান সিটি, কানাডা, ব্রাজিল, আলজেরিয়া, কসোভো, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রতিনিধি, আইআরআই এবং এনডিপি’র আবাসিক প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকবৃন্দ শরীক হন।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর