সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে স্ব-নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর ওপর গুরুত্বারোপ
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে বাহ্যিক চাপ কমানো, পেশাগত মান বজায় রাখা এবং পাঠক-দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সংবাদমাধ্যমগুলোতে স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদারে, বিশেষ করে অভ্যন্তরীন সম্পাদকীয় চর্চা এবং জবাবদিহি কাঠামো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) ঢাকায় মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত পরামর্শ সভায় এ বিষয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সম্পাদকীয় নীতিমালার কার্যকর চর্চা, পরিচালন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং পাঠক-দর্শকের জন্য উপযোগী অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি বাস্তব ও কার্যকর পথ হতে পারে। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নৈতিক মান বজায় রেখে, স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার মধ্য দিয়ে দর্শক-শ্রোতার আস্থা ফিরিয়ে আনতে এটি সহায়তা করবে।
সংবাদমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি ও অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে পলিসি পেপার প্রকাশ করে এমআরডিআই। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পেশাগত ও নৈতিক মানোন্নয়নের পথ নিয়ে আলোচনা এবং সংবাদমাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করার সম্ভাব্য কাঠামো মূল্যায়নের অংশ হিসেবে সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক, সংবাদমাধ্যম সিদ্ধান্তগ্রহীতা, সাংবাদিক ইউনিয়ন ও অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক এবং উন্নয়ন সহযোগীদের উপস্থিতিতে এই পলিসি পেপারটি প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম সংস্কারের লক্ষ্যে এমআরডিআই- এর পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার (২০২৫-৩০) অংশ হিসেবে এবং সংবাদমাধ্যমে পেশাগত তদারকি, জবাবদিহি ও অভিযোগ প্রতিকারের কার্যকর উপায় হিসেবে স্ব-নিয়ন্ত্রণকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত ধারাবাহিক কার্যক্রমের ফলাফল হিসেবে এই পলিসি পেপারটি তৈরি করা হয়েছে।
সাংবাদিকতায় কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে তা সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই শুরু করার বিষয়ে পলিসি পেপারে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বাহ্যিক বা দমনমূলক নিয়ন্ত্রণ নয় বরং স্বচ্ছ সম্পাদকীয় মানদণ্ড ও নীতিমালা, দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক সংশোধন প্রক্রিয়া, মালিকানা জবাবদিহি এবং পাঠক-দর্শকের জন্য সহজলভ্য অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে টেকসই সমাধান হতে পারে।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম সংবাদমাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণের পক্ষে তার সমর্থন ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সেলফ-রেগুলেশন যত কার্যকর হবে, সরকারি হস্তক্ষেপ তত কমবে। সেলফ-রেগুলেশনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোকে উল্লেখ করে তিনি বলেন প্রথমত, সাংবাদিকদের সম্মিল্লিতভাবে অঙ্গীকার করতে হবে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ পেশাগত কাজে প্রভাব ফেলবে না। একইভাবে, মালিকদেরও স্পষ্টভাবে বলতে হবে তারা তাদের গণমাধ্যমকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে দেবেন না এবং সম্পাদককে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ও কার্যকর পরিচালনার ক্ষমতা দিতে হবে।
নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় সব সমাধান উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, একটি মিডিয়া কমিশন হবে যেখানে সরকার যেমন অর্থায়ন করবে, তেমনি গণমাধ্যমগুলোও অর্থায়ন করবে এবং এটি স্বাধীনভাবে পরিচালিত হবে। সাংবাদিকদের ওপর কেউ অন্যায় করলে সেখানে বিচার পাওয়ার সুযোগ থাকবে, আবার কোনো সংবাদমাধ্যম যদি অসত্য সংবাদ প্রকাশ করে, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি জানান, সম্পাদক পরিষদ, নোয়াব এবং সংশ্লিষ্ট সবপক্ষ একসঙ্গে সারা দেশে একটি যৌথ প্রচারণা চালাবে, যেখানে এই বার্তা দেয়া হবে যে আমাদের (সংবাদমাধ্যমের) মধ্যে কোনো বিভাজন নেই। আমরা (সংবাদমাধ্যম) সত্য প্রকাশ করব, তা সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে যেখানেই যাক।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ বলেন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তার আস্থার উপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ পর্যন্ত পাঠক, শ্রোতা, দর্শকের গণমাধ্যমের ওপর আস্থা থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত আমরা স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবো। এই আস্থার জন্য আমাদের নিজেদের জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে। বহু জায়গায় সাংবাদিকরা অপসাংবাদিকতা করেন যা তারা শুধু তাদের নিজেদের জন্য করেন তা নয়, মালিকদের জন্যও করতে বাধ্য হন। এসব বন্ধ করতে সেলফ রেগুলেশন দরকার। এখানে নোয়াব বা সম্পাদক পরিষদ-এর জন্য অপেক্ষা না করে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের উদ্যোগেই তা করতে পারে। দুই একটা হাউজ ইতিমধ্যে করেছেও।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, প্রায়োগিক ব্যবস্থা ছাড়া গণমাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণ কতটুকু কার্যকর হবে সেটা নিয়ে একটু চিন্তা করার অবকাশ আছে। সেলফ রেগুলেশন ভালো উদ্যোগ। বেশ কয়েকটি উন্নত দেশে স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বজায় রাখা হয়, কিন্তু আমাদের দেশে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। বিভিন্ন আমলে সংবাদমাধ্যমকে নানা নিপীড়নমূলক আইনের মাধ্যমে হয়রানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
বাংলাদেশে ইউনেস্কোর হেড অব অফিস ও রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. সুসান ভাইজ মুক্ত আলোচনায় তার বক্তব্যে গণমাধ্যমের ওপরে পাঠক, দর্শকের আস্থা কেমন তা জানার জন্য গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানুষের আস্থার সঙ্গে সাংবাদিকের নিরাপত্তার এক ধরনের যোগসূত্র আছে। মানুষ সাংবাদিকদের আস্থায় নিলে তাদের ক্ষতি করার কথা ভাবে না বরং সাংবাদিকদের পাশে থাকার তাগিদ অনুভব করে। জবাবদিহিমূলক সম্পর্কের ভিত্তিতে এই আস্থা গড়ে উঠলে তা গণমাধ্যমের জনপ্রিয়তা, প্রচারসংখ্যা এবং বিজ্ঞাপনের সংখ্যা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
মুক্ত আলোচনায় সুইডেন দুতাবাসের প্রথম সচিব পাওলা ক্যাস্ট্রো নিডারস্টাম সুইডেনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, সারা বিশ্বের মানুষ সুইডেনের গণমাধ্যম ব্যবস্থার প্রশংসা করে, তবে এর কেন্দ্রে আছে এর স্বাধীন আচরণ এবং সত্য বলার অভ্যাস। গণমাধ্যমের এই অবস্থান হঠাৎ করে হয়নি, বহু বছরের পরিকল্পনা, সদিচ্ছা এবং স্বচ্ছ স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দরকার হয়েছে।
এমআরডিআই-এর পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংবাদমাধ্যমের সংস্কারে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এমআরডিআই নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান। তিনি জানান, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে, বিশেষত স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন এবং সাংবাদিকতা সুরক্ষা আইন নিয়ে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম এবং সম্পাদকীয় সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করতে এমআরডিআই-এর সহযোগিতা চলমান থাকবে।
প্যানেল আলোচনায় আরও অংশ নেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ, মাছরাঙা টেলিভিশনের সম্পাদক ও ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের চেয়ারম্যান রেজোয়ানুল হক, যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এস এম রেজওয়ান উল আলম। এ ছাড়াও, সম্পাদকবৃন্দ, সংবাদমাধ্যম উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা, বিভিন্ন দূতাবাস ও হাইকমিশনের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীরাও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
LIMON

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: